হিজরি নববর্ষের মৌলিক পাঁচটি শিক্ষা

সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

কালের অতল গর্ভে হারিয়ে গেল আরও একটি হিজরি বর্ষ। সূচনা হলো ১৪৪৮ হিজরি বর্ষের। নতুন বছরে পদার্পণ। জীবনকে নতুন করে সাজানোর আরও একটি সুযোগ সৃষ্টি করে। বিগত বছরে নিজের ভুলত্রুটির কথা ভেবে মুমিন হৃদয়ে অনুশোচনা জেগে ওঠে। স্বভাবতই মুমিন তাই ইসতিগফারের পবিত্র পথে হাঁটে। নতুন বছরে সে ভুলত্রুটি কাটিয়ে ওঠার প্রতিজ্ঞা করে। তাই নতুন বছরের সূচনায় মুমিন বল্গাহারা আনন্দে মেতে ওঠে না।

যেভাবে সূচনা হিজরি বর্ষের

হিজরি বর্ষের সূচনা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতকে কেন্দ্র করে। হিজরি বর্ষের নির্ধারণ ও সূচনার ইতিহাস নিয়ে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। এর মাঝে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ বর্ণনাটি হলো- তখন খলিফা আমিরুল মুমিনীন ওমর ফারুক (রা.)-এর শাসনামল। প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু মুসা আশআরী (রা.) ইরাক এবং কুফার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একবার আবু মুসা আশআরী (রা.) খলিফা ওমর (রা.)-এর খেদমতে এ মর্মে পত্র লিখেন যে আপনার পক্ষ থেকে পরামর্শ কিংবা নির্দেশসংবলিত যেসব চিঠি আমাদের কাছে পৌঁছে তাতে দিন, মাস, কাল, তারিখ ইত্যাদি না থাকায় কোন চিঠি কোন দিনের তা নিরূপণ করা আমাদের জন্য সম্ভব হয় না।

এতে করে আমাদের নির্দেশ কার্যকর করতে সমস্যা হয়। অনেক সময় আমরা বিব্রতবোধ করি চিঠির ধারাবাহিকতা না পেয়ে। আবু মুসা আশআরীর চিঠি পেয়ে হজরত ওমর (রা.) এ মর্মে পরামর্শ সভার আহ্বান করেন যে এখন থেকে একটি ইসলামি তারিখ প্রবর্তন করতে হবে। ওই পরামর্শ সভায় হজরত উসমান (রা.), হজরত আলি (রা.)সহ বিশিষ্ট অনেক সাহাবি উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত সবার পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে ওই সভায় ওমর (রা.) সিদ্ধান্ত দেন ইসলামি সন প্রবর্তনের। তবে কোন মাস থেকে বর্ষের সূচনা করা হবে তা নিয়ে পরস্পরের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি হয়। কেউ মত পোষণ করেন রসুল (সা.)-এর জন্মের মাস রবিউল আউয়াল থেকে বর্ষ শুরু করার। আবার কেউ কেউ মত পোষণ করেন রসুল (সা.)-এর ওফাতের মাস থেকে বর্ষ শুরু করা হোক। অন্যান্যের মতে নবীজি (সা.)-এর হিজরতের মাস থেকে বর্ষ করা হোক। অনেক আলোচনা পর্যালোচনা শেষে প্রাজ্ঞ সাহাবিদের পরামর্শে ওমর ফারুক (রা.) হিজরতের সময়কাল থেকে বর্ষ গণনা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, হিজরত হলো হক বাতিলের মাঝে পার্থক্যকারী। (আল কামিল ফিত তারিখ: ১/৯)।

হিজরি নববর্ষের পাঁচটি শিক্ষা

এক. আত্মত্যাগের চেতনা

মক্কা থেকে মদিনায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরত পার্থিব মোহ, আত্মীয়স্বজন ও জন্মভূমি ত্যাগের এক অনুপম দৃষ্টান্ত। নিজের ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা দেয় হিজরি নববর্ষ।

দুই. নব উদ্যমে জীবন সাজানোর প্রেরণা 

নতুন বছরটি জীবনের সামগ্রিক গতিপথ পুনর্বিবেচনার উপযুক্ত সময়। বিগত বছরের ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিনগুলোতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নতুন করে শপথ গ্রহণের সুযোগ পাওয়া যায়।

তিন. অবিচল ইমান ও ধৈর্যের অনুশীলন

প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সত্যের পথে টিকে থাকতে হিজরত আমাদের ধৈর্য ও সাহসিকতার শিক্ষা দেয়। সব বাধাবিপত্তি পেরিয়ে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা এটি।

চার. আল্লাহর হুকুমকে অগ্রাধিকারপ্রদান 

মক্কাতুল মুকাররমা। সাহাবায়ে কিরামের জন্মভূমি। শৈশব কৈশোর আর যৌবনের সোনাঝরা দিনগুলো এখানে কেটেছে। জন্মভূমির প্রতি টান মানুষের স্বভাবজাত। স্বভাবজাত এই টানকে উপেক্ষা করে সাহাবায়ে কিরাম এক অনন্য ইতিহাস বিনির্মাণ করেছেন। আল্লাহর হুকুমকে প্রাধান্য দিয়ে জন্মভূমির মায়া ছেড়ে দূর মদিনায় তাঁরা হিজরত করেছেন। সুতরাং হিজরি বর্ষ আমাদের বার্তা দিয়ে যায় যে সর্বাবস্থায় আল্লাহর হুকুমকে প্রাধান্য দিতে হবে।

পাঁচ. দুঃসময়ে আল্লাহর ওপর ভরসা

বর্তমান সময়ের এক বড় সমস্যার নাম ‘ডিপ্রেশন বা হতাশা’। সামান্য প্রতিকূলতায় আমরা ভেঙে পড়ি। হতাশ হয়ে যাই। দুঃসময়ে খেই হারিয়ে ফেলি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই একটি বাস্তব কথা। দুঃসময়ের অন্ধকার কখনো কখনো আমাদের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্তটির দ্বার খুলে দেয়। হিজরি বর্ষ এই চমৎকার শিক্ষাটি আমাদের সামনে তুলে ধরে। সাহাবায়ে কেরাম দুঃসময়ে ভেঙে পড়েননি। তাঁরা আল্লাহর ওপর ভরসা করেছিলেন। এই হিজরতই ছিল তাঁদের দুঃসময় কাটিয়ে ওঠার উজ্জ্বল মুহূর্তের সূচনা। সুতরাং আপনিও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। দুঃসময় কেটে যাবে। জীবন প্রশান্তিতে ভরে উঠবে ইনশাআল্লাহ।

Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *