আরাফার রোজা কবে ২০২৬? সঠিক তারিখ, ফজিলত ও আমল

আরাফার রোজা কবে ২০২৬? ২০২৬ সালে পবিত্র হজ ও আরাফার দিন সৌদি আরবে ২৬ মে (মঙ্গলবার) পালিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাংলাদেশে চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে জিলহজ মাসের তারিখ নির্ধারিত হয়। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে বাংলাদেশে ২৭ মে (বুধবার) জিলহজ মাসের ৯ তারিখ বা আরাফার দিন হতে পারে। ইসলামি স্কলারদের মতে, তারিখের এই মতপার্থক্য এড়াতে এবং পূর্ণ সওয়াব নিশ্চিত করতে বাংলাদেশীদের জন্য ২৬ ও ২৭ মে (মঙ্গলবার ও বুধবার) উভয় দিনই নফল রোজা রাখা সবচেয়ে নিরাপদ ও উত্তম।

আরাফার রোজা কবে ২০২৬

আরাফার রোজা রাখার তারিখ নিয়ে আমাদের দেশে প্রতি বছরই একটি ধোঁয়াশা তৈরি হয়। আমরা কি সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে যেদিন হাজীরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন সেদিন রোজা রাখব? নাকি আমাদের দেশের চাঁদ দেখা অনুযায়ী ৯ জিলহজ তারিখে রাখব?

ওলামায়ে কেরামের গবেষণায় এখানে দুটি মত পাওয়া যায়:

  1. হাজীদের অবস্থানের দিন (আরাফার ময়দান কেন্দ্রিক): অনেক আলেমের মতে, আরাফার রোজা মূলত আরাফাতের ময়দানে হাজীদের অবস্থানের সাথে সম্পৃক্ত। তাই পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, হাজীরা যেদিন আরাফাতে থাকবেন সেদিনই রোজা রাখা উচিত। ২০২৬ সালের সম্ভাব্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিনটি হলো ২৬ মে, মঙ্গলবার (যা বাংলাদেশে সম্ভবত ৮ জিলহজ হবে)।
  2. নিজ দেশের তারিখ অনুযায়ী (৯ জিলহজ কেন্দ্রিক): অন্য স্কলারদের মতে, ইসলামি শরীয়ত চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। ‘ইয়াওমে আরাফা’ বা আরাফার দিন মূলত জিলহজ মাসের ৯ তারিখকেই বোঝায়। তাই নিজ দেশের ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী যেদিন ৯ জিলহজ হবে, সেদিনই রোজা রাখতে হবে। বাংলাদেশে এই দিনটি হতে পারে ২৭ মে, বুধবার

কোন দিনটি বেছে নেবেন?

যেহেতু কোনো মতের পক্ষেই সুস্পষ্ট ও সরাসরি কোনো হাদিস নেই (উভয়টিই গবেষণামূলক), তাই সবচেয়ে টেকসই এবং নিরাপদ আমল হলো উভয় দিন রোজা রাখা। জিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিনই নফল রোজা রাখা মুস্তাহাব। তাই আপনি যদি ২৬ মে এবং ২৭ মে (মঙ্গলবার ও বুধবার) দুই দিনই রোজা রাখেন, তবে নিঃসন্দেহে আপনার আরাফার রোজা আদায় হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

আরাফার রোজার বিশাল ফজিলত ও মর্যাদা

সারা বছরের যেকোনো নফল রোজার চেয়ে আরাফার দিনের রোজার মর্যাদা সবচেয়ে বেশি। সহীহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, নবী কারীম (সা.) এই রোজার ফজিলত সম্পর্কে বলেছেন:

  • দুই বছরের গুনাহ মাফ: আরাফার দিনের একটি রোজার বিনিময়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বান্দার এক বছর পূর্বের এবং আগামী এক বছরের (অগ্রিম) ছোটখাটো গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন।
  • জাহান্নাম থেকে মুক্তি: বছরের অন্য যেকোনো দিনের তুলনায় এই দিনে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।
  • শ্রেষ্ঠ দোয়া কবুলের দিন: আরাফার দিনের দোয়াকে সারা বছরের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দোয়া হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

(নোট: এই রোজাটি শুধুমাত্র তাদের জন্য, যারা হজে যাননি এবং নিজ নিজ দেশে অবস্থান করছেন। হাজীদের জন্য আরাফার রোজা রাখা মুস্তাহাব নয়।)

জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের বিশেষ আমল

জিলহজ মাসের প্রথম দশক (১-১০ তারিখ) ইবাদতের বসন্তকাল। এই দিনগুলোর নেক আমল আল্লাহর কাছে জিহাদের চেয়েও বেশি প্রিয়। এই দশকে যে আমলগুলো বেশি বেশি করা উচিত:

  • নফল রোজা: সম্ভব হলে ১ থেকে ৯ জিলহজ পর্যন্ত প্রতিদিন রোজা রাখা। অন্তত ৮ ও ৯ জিলহজ রোজা রাখা।
  • তাকবির, তাহমিদ ও তাহলিল: চলতে-ফিরতে, বাজারে বা ঘরে বেশি বেশি পাঠ করা— ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ’
  • আরাফার দিনের শ্রেষ্ঠ দোয়া: আরাফার দিন বেশি বেশি এই জিকিরটি পড়া: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলক ওয়া লাহুল হামদ, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির’
  • চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকা: যারা কোরবানি করার নিয়ত করেছেন, তারা জিলহজ মাসের চাঁদ ওঠার পর থেকে কোরবানি সম্পন্ন করা পর্যন্ত শরীরের অবাঞ্ছিত পশম, চুল এবং নখ কাটা থেকে বিরত থাকবেন।
  • রোজাদারকে ইফতার করানো: আরাফার দিন প্রচুর মানুষ নফল সিয়াম পালন করেন। এ দিন অন্য রোজাদারকে ইফতার করালে সমান সওয়াব পাওয়া যায়।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

১. আরাফার রোজা কি একটি না দুটি?

উত্তর: আরাফার রোজা মূলত একটি। তবে ভৌগোলিক অবস্থান ও চাঁদ দেখার ভিন্নতার কারণে তারিখ নিয়ে কনফিউশন তৈরি হয়। তাই সতর্কতা হিসেবে স্কলাররা নিজ দেশের ৮ ও ৯ জিলহজ মিলিয়ে মোট দুটি রোজা রাখার পরামর্শ দেন।

২. আরাফার রোজা যদি শুক্রবার পড়ে, তবে কি রাখা যাবে?

উত্তর: শুধু জুমার দিন (শুক্রবার) এককভাবে নফল রোজা রাখতে হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে। তবে দিনটি যদি আরাফার দিন হয়, তবে শুক্রবার হলেও রোজা রাখা জায়েজ। কারণ আপনি শুক্রবার হিসেবে নয়, বরং আরাফার দিন হিসেবে রোজাটি রাখছেন।

৩. যারা কোরবানি করবেন না, তারা কি চুল-নখ কাটা থেকে বিরত থাকবেন?

উত্তর: এই নিয়মটি মূলত তাদের জন্য যারা কোরবানি করবেন। তবে কোনো কোনো আলেমের মতে, কোরবানি করার সামর্থ্য না থাকলেও জিলহজের প্রথম ১০ দিন চুল-নখ না কেটে ঈদের দিন কাটলে কোরবানির সওয়াব পাওয়া যেতে পারে।

৪. কিস্তিতে কোরবানির পশু বা পণ্য কিনলে কি গুনাহ হবে?

উত্তর: না। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট মূল্যে এবং নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তিতে কিস্তিতে কেনাবেচা করা সম্পূর্ণ হালাল, যদি সেখানে কোনো লুকানো সুদ বা ইন্টারেস্ট না থাকে।

Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *