সোমবার, ০১ জুন, ২০২৬
এবারের ঈদুল আজহায় দেশে এক কোটিরও বেশি পশু কোরবানি হয়েছে। এ থেকে প্রাপ্ত চামড়া সংরক্ষণে প্রায় ৬০ হাজার টন লবণের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ সারা দেশের মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোয় বিনামূল্যে সরবরাহ করেছে সরকার।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্রে জানা গেছে, দেশে এ বছর ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৪টি পশু কোরবানির প্রাক্কলন করে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। এ থেকে প্রাপ্ত চামড়া সংরক্ষণে লবণের চাহিদা নির্ধারণ করা হয় ৫৯ হাজার ৫৯০ টন। এর মধ্যে বিসিকের পক্ষ থেকে জেলাওয়ারি ৯ হাজার ৮১৯ টন লবণ বিনামূল্যে বিতরণের উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে শেষ মুহূর্তে দেশব্যাপী লবণের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ও মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ চামড়া সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। অন্যদিকে জেলা পর্যায় থেকে চাহিদা কম আসার পাশাপাশি বরাদ্দ দেয়া মিলগুলোর ব্যর্থতায় শেষ পর্যন্ত ৯ হাজার ৪৬৩ টন লবণ বিতরণ করেছে বিসিক।
জানা গেছে, ঈদুল আজহার আগে দেশব্যাপী চামড়া সংরক্ষণ শতভাগ নিশ্চিত করতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মিল পর্যায়ে জরিপ চালায় বিসিক। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলায় ঈদের আগে লবণের মজুদ ছিল মোট ৮৯ হাজার ৩৯৪ টন। এ হিসাবে এবার কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে লবণের ঘাটতি হওয়ার সুযোগ ছিল না। তারপরও এতিমখানা, মসজিদ ও মাদরাসা কর্তৃক সংগ্রহকৃত চামড়া যথাযথভাবে সংরক্ষণের লক্ষ্যে বিসিকের পক্ষ থেকে দ্বিতীয়বারের মতো বিনামূল্যে লবণ বিতরণ করা হয়।
জানতে চাইলে বিসিকের লবণ সেল প্রধান সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিসিক ২০২৫ সাল থেকে দেশব্যাপী মাঠ প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী বিনামূল্যে লবণ বিতরণ করে আসছে। এ বছর ঈদুল আজহার একদিন আগেই এ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।’
বিসিকের এ ব্যতিক্রমী কার্যক্রমের ফলে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা আগের চেয়েও অনেক বেশি সুশৃঙ্খল হয়েছে বলেও দাবি করেন এ কর্মকর্তা।
বিসিকের তথ্যমতে, এবার ঢাকা বিভাগে ২ হাজার ৪০৪ দশমিক ২৪ টন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৪৭ টন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২ হাজার ৩২৯ দশমিক ৮০ টন, সিলেট বিভাগে ৭৫০ টন, খুলনা বিভাগে ১ হাজার ৪৭ দশমিক ৫০ টন, বরিশাল বিভাগে ৬১৩ টন, রাজশাহী বিভাগে ১ হাজার ৮৬ দশমিক ৪৭ টন এবং রংপুর বিভাগে ৮৮৫ টন লবণ বিতরণ করা হয়েছে। এজন্য বিসিকের পক্ষ থেকে ১৭ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এছাড়া চামড়া সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ খাতে সংস্থাটির খরচ হয়েছে ২ কোটি ৬৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
জানা গেছে, ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী বিনামূল্যে লবণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয় বিসিক। শুরুতে ৩০ হাজার টনের পরিকল্পনা করা হলেও মাঠ প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী ১১ হাজার ৫৭১ টন সরবরাহ করা হয়। ২০ কোটি টাকা বরাদ্দের ওই লবণ জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করা হয়। তবে এবার দেশে লবণের উৎপাদন কম হওয়ায় ঈদুল আজহার আগে দাম বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে বিসিকের বরাদ্দ ২০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় লবণ বিতরণের পরিমাণ ১ হাজার ৭৫২ টন কমে ৯ হাজার ৮১৯ টনে নেমে আসে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. মোসলেম চৌধুরী বলেন, ‘দুই মাস আগেও দেশের লবণের দাম ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ঈদুল আজহার আগে তা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বিসিকের পক্ষ থেকে মাদরাসা ও এতিমখানায় বিনামূল্যে লবণ বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ ব্যবসায়ী ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বাজার থেকে নগদ অর্থে লবণ কিনে চামড়া সংরক্ষণ করেছেন। দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই চামড়া সংরক্ষণ করতে পারেননি। বর্ধিত দামের কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণ লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে না পারায় চামড়ার গুণগত মানে প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে।’
এজন্য ঈদুল আজহার আগে ও পরে লবণের বাজারে কঠোর মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনার দাবি জানান এ ব্যবসায়ী।
বিসিক সূত্রে জানা গেছে, এ বছর দেশে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৫ লাখ ২২ হাজার টন। আর ১৮ মে পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ১৮ লাখ টনের কিছু বেশি। আগাম বৃষ্টিপাত ও বিরূপ আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে সরবরাহ কমে যাওয়ায় মাঠ ও মিল পর্যায়ে লবণের দাম বেড়ে যায়। এ কারণে ঈদুল আজহার সময়ে চামড়া সংরক্ষণে লবণ সংগ্রহ নিয়ে বিপাকে পড়েন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
