সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মীয়মাণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘিরে বদলে গেছে পুরো জেলার অর্থনীতি, অবকাঠামো ও জীবনযাত্রার মান। একসময়ের কৃষি ও বস্ত্রশিল্পনির্ভর জেলা হিসেবে পরিচিত পাবনা এখন পরিণত হচ্ছে আধুনিক শিল্প, বাণিজ্য ও পর্যটনের নতুন কেন্দ্র হিসেবে।
রূপপুর প্রকল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, রিসোর্ট, শপিং মল, পার্ক, আধুনিক আবাসন ও নানা ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। সৃষ্টি হয়েছে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান, বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার আয়ও। ২০০৯ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে।
২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাশিয়ার রোসাটম স্টেট এনার্জি করপোরেশনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের সঙ্গে চুক্তি সই হয়। প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মীয়মাণ এই প্রকল্প দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ১০ শতাংশ পূরণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ৬০ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পে প্রায় আড়াই হাজার দক্ষ জনবলের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং ১৮ লাখ পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধা পাবে।
রূপপুর প্রকল্পের কাজ শুরুর পর দেশি-বিদেশি ১৭টি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে চার হাজার রাশিয়ার নাগরিক রয়েছেন।তাঁদের আবাসনের জন্য ঈশ্বরদী-কুষ্টিয়া সড়কের নতুনহাট এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক ২২টি ২০ তলা ভবন নিয়ে ‘গ্রিন সিটি’। এই এলাকাকে এখন বিশ্বের আধুনিক শহরগুলোর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। গ্রিন সিটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, শপিং মল, ফুড কোর্ট ও আধুনিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জীবনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। স্থানীয় নতুনহাট বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. আলম বলেন, ‘পাঁচ-ছয় বছর আগেও এখানে তেমন কোনো দোকান ছিল না।
এখন অসংখ্য দোকান হয়েছে। রাশিয়ানরাও নিয়মিত বাজার করতে আসেন।’
ফল ব্যবসায়ী রাজন হোসেন জানান, ঢাকায় কাজ ছেড়ে তিনি এখন ঈশ্বরদীতেই ব্যবসা করছেন। এখানে লাভও বেশি হয়। ভালোই চলে।
কাপড় ব্যবসায়ী জিহাদ হোসেন বলেন, ‘রাশিয়ানরা প্রতিদিন পোশাক কিনতে আসেন। তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন নতুন দোকান গড়ে উঠেছে। তাঁদের দেখাদেখি আমাদের দেশের ক্রেতারাও আসছেন এখন।’
পর্যটন ও বিনোদন খাতেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। পাবনায় গড়ে উঠেছে রত্নদ্বীপ রিসোর্ট, রূপকথা ইকো রিসোর্ট, স্বপ্নদ্বীপ রিসোর্ট, পাকশী রিসোর্ট, রানা ইকো পার্ক ও সত্যলোক ইকোপার্কসহ নানা বিনোদনকেন্দ্র। রত্নদ্বীপ রিসোর্ট ও রূপকথা ইকো রিসোর্টের কর্ণধার সোহানী হোসেন বলেন, ‘বিদেশি নাগরিকদের কথা বিবেচনায় রেখেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে রাশিয়ার নাগরিকরা আসছেন এবং স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটাচ্ছেন। আমাদের দেশের বিনোদনপ্রেমীরাও আসছে।’
স্বপ্নদ্বীপ রিসোর্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুনেম তাজওয়ার অহিন বলেন, ‘রূপপুর প্রকল্প ও ইপিজেডে কর্মরত বিদেশিরা নিয়মিত এখানে আসেন। আমাদের এখানে রাশিয়ান, ইন্ডিয়ান, চায়নিজ ও কনটিনেন্টাল খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে।’
রিসোর্টটির পরিচালক খাইরুল ইসলাম জানান, আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। শুধু রূপপুর নয়, এই উন্নয়ন প্রকল্পে পাল্টে গেছে পাবনার যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থনীতি।
স্থানীয় উন্নয়নকর্মী এস এম জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘রূপপুর প্রকল্প আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে। বহু যুবক বেকারত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে। পুরো পাবনার চিত্রই যেন বদলে দিয়েছে এ প্রকল্প। দেশি-বিদেশি পর্যটক আসছে পাবনায়। এটি আমাদের বড় পাওনা।’
পাবনা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি এস এম আদনান উদ্দিন বলেন, ‘রূপপুরকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়েছে। এটি পাবনার অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে।’
নিটল মটরসের অনুমোদিত ডিলার মান্না সরদার প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাইদুল ইসলাম মান্না সরদার বলেন, ‘রূপপুর প্রকল্প ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্যের যে প্রসার ঘটেছে, ভবিষ্যতে পাবনা একটি বড় বাণিজ্যিক ও পর্যটন নগরীতে পরিণত হবে।’
