শিরোনাম

হুতি-সৌদি সংঘাতে কি সামরিকভাবে জড়াবে যুক্তরাষ্ট্র?

 রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও আমেরিকান ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক উইলিয়াম লরেন্স।

তার মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের হুতিদের বিরুদ্ধে হামলার অনুরোধ নাকচ করেছেন বলে খবর এলেও ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত সংঘাতে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হতে পারে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লরেন্স বলেন, ইয়েমেনের সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থ, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ায় ওয়াশিংটনের জন্য এ সংঘাত থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা কঠিন হতে পারে।

তিনি বলেন, “আমি মনে করি, কোনও এক পর্যায়ে তারা (যুক্তরাষ্ট্র) এতে জড়াবে। অতীতে তারা দেখিয়েছে, ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানে হস্তক্ষেপে তারা প্রস্তুত।”

হরমুজ ও বাব আল-মানদেব নিয়ে উদ্বেগ
লরেন্সের মতে, ইয়েমেনে হুতি-সৌদি সংঘাতের গুরুত্ব শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ—হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদেব প্রণালির নিরাপত্তা সরাসরি জড়িত।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ হয়। অন্যদিকে বাব আল-মানদেব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে এই দুই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে জ্বালানি সরবরাহ, পণ্য পরিবহন ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়তে পারে।

লরেন্স বলেন, গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি ধারণা জোরালো হয়েছে যে, সৌদি আরবকে সুরক্ষা দিতে এবং হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ওয়াশিংটনের ‘কিছু করা প্রয়োজন’।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, তা এখনও স্পষ্ট নয় বলে জানান তিনি।

সৌদির নিরাপত্তায় মার্কিন প্রতিশ্রুতি
লরেন্সের মতে, সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সম্পর্কও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের ওপর হুতি হামলা বাড়তে থাকলে রিয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনের ওপর রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপ বাড়তে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনই সরাসরি হামলায় যাবে কি না, তা নির্ভর করবে পরিস্থিতির ওপর। এর আগে ট্রাম্প সৌদি আরবের পক্ষ থেকে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

লরেন্সের মতে, সরাসরি সামরিক অভিযান ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য সামরিক সহায়তা বাড়াতে পারে।

ইতোমধ্যে ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে
লরেন্সের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে এ সংঘাতে নতুন করে সম্পৃক্ত হতে হলে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে না। কারণ সৌদি আরবের নিরাপত্তায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও সহায়তা ইতিমধ্যে রয়েছে।

তিনি জানান, সৌদি আরবে বর্তমানে প্রায় ১০০ জন মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা রয়েছেন। পাশাপাশি সৌদি আরবকে ব্যাপক গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি এবং রিকনাইস্যান্স সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

লরেন্স বলেন, “তাই আমেরিকানদের আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া খুব বড় ধরনের পদক্ষেপ হবে না।”

তবে সামরিক উপদেষ্টা ও গোয়েন্দা সহায়তা থেকে সরাসরি হামলা বা যুদ্ধের অংশগ্রহণে যাওয়া একটি ভিন্ন মাত্রার সিদ্ধান্ত। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ইয়েমেনের সংঘাত আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

হুতিদের অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ
ইরান-সমর্থিত হুতিদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রগতি সৌদি আরবের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। লোহিত সাগরের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা এবং কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে হুতিদের প্রভাব বাড়ায় নৌপথের নিরাপত্তা নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা বাড়তে থাকায় সংঘাতটি এখন শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিরাপত্তা স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তাও জড়িয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে একদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি রক্ষা, অন্যদিকে নতুন একটি মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি—দুই দিকই বিবেচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *