শিরোনাম

ডাকসুর মূল্যায়ন উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ, শিক্ষকেরা ক্ষুব্ধ

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য ডাকসু যে ওয়েবসাইট তৈরি করেছে, তা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে। শিক্ষকদের বেশির ভাগ ডাকসুর এই উদ্যোগে ক্ষুব্ধ। তাঁরা মনে করছেন, উদ্যোগটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেওয়া উচিত ছিল, ডাকসুর নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ১০ সেপ্টেম্বর ওয়েবসাইটটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করে। এরপর গতকাল রোববার বিকেল চারটা পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৮৯ জন শিক্ষার্থী শিক্ষকদের মূল্যায়ন করেছেন। কোন শিক্ষক কত নম্বর পেয়েছেন, তা ওয়েবসাইটটি থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনেক শিক্ষক ব্যঙ্গ ও কটূক্তির (ট্রল) শিকার হচ্ছেন।

শিক্ষক মূল্যায়নের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্কতার সঙ্গে করা দরকার। এর মধ্যে কিছু বিষয় গোপনীয় রাখতেই হবে, নইলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর

শিক্ষকেরা বলছেন, এখতিয়ারের বাইরে শিক্ষকদের মূল্যায়নের উদ্যোগ অগ্রহণযোগ্য। তার চেয়েও অগ্রহণযোগ্য প্রাপ্ত নম্বর গোপন রাখতে না পারা। পড়াতে না পারলে শিক্ষককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে। তবে হেয় করার সুযোগ নেই।

ডাকসু যেভাবে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করেছে, তার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। এদিকে সমালোচনার মুখে গতকাল মূল্যায়নে শিক্ষকদের প্রাপ্ত নম্বর দেখার সুযোগ বন্ধ করে দেয় ডাকসু। কিন্তু এর আগেই নম্বর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্কতার সঙ্গে করা দরকার। এর মধ্যে কিছু বিষয় গোপনীয় রাখতেই হবে, নইলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, শিক্ষকদের কাজ শুধু ক্লাস নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা গবেষণা ও অন্যান্য কাজের সঙ্গেও যুক্ত থাকেন। এ ধরনের জরিপ তাই শিক্ষক সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেয় না।

মূল্যায়ন কেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০০ সালে বিভাগের সংখ্যা ছিল ৪৭। এখন ৮৪টি। দুই দশকে ৯টি থেকে বেড়ে ইনস্টিটিউট হয়েছে ১২টি। সাড়ে ২২ হাজার থেকে নিয়মিত শিক্ষার্থী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজারের বেশি। শিক্ষকসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজারে (২ হাজার ১৫ জন)।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষক রাজনীতিতে দল ভারী করতে একের পর এক বিভাগ খোলা ও শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষকদের অনেকের বিরুদ্ধে নিজেরা পড়াশোনা না করা, গবেষণায় ফাঁকি দেওয়া এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অদক্ষতার অভিযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অপছন্দের শিক্ষার্থীদের নম্বর কম দেওয়া, পছন্দের শিক্ষার্থীকে বেশি দেওয়া এবং হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ কম। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের মূল্যায়নের দাবিও ছিল।

২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনের আগে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ইশতেহারে শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি ছিল। মেয়াদ শেষের চার দিন আগে শিক্ষক মূল্যায়নের একটি ওয়েবসাইট চালু করে ডাকসু। নাম ‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’।

শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার একটা বিশাল সুযোগ এখানে তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।

আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, ঢাবির সহ-উপাচার্য

ওয়েবসাইটটি চালুর ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া। তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। ওয়েবসাইট চালুর অনুষ্ঠানে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েমসহ শিবির-সমর্থিত প্যানেলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন না ডাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।

উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইটটি চালুর জন্য তিনি বিগত এক বছর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে গিয়েছেন; কিন্তু পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আপত্তি থাকলেও ওয়েবসাইটটি চলবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ডাকসু জানিয়েছে, তিন মাসের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। সেই প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দেওয়া হবে।

ডাকসুর নির্ধারিত এক বছরের মেয়াদ আজ সোমবার শেষ। গঠনতন্ত্র বলছে, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না হলে মেয়াদ তিন মাস বাড়বে।

শিক্ষকেরা কতটা স্পষ্টভাবে পড়ান, প্রশ্ন ও আলোচনায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন কি না, তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করেন কি না এবং নিয়মিত ও সময়মতো ক্লাস নেন কি না—এসব বিষয়েও মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন

ডাকসুর তৈরি ওয়েবসাইটে ঘুরে দেখা গেছে, শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য সেখানে বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কোর্সের কাঠামো ও পাঠ্যসূচি, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, পেশাদারি এবং সার্বিক সন্তুষ্টি।

শিক্ষকেরা কতটা স্পষ্টভাবে পড়ান, প্রশ্ন ও আলোচনায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন কি না, তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করেন কি না এবং নিয়মিত ও সময়মতো ক্লাস নেন কি না—এসব বিষয়েও মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়ন শুরু করল ডাকসু, বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন প্রশাসনের

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়ন শুরু করল ডাকসু, বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন প্রশাসনের

২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সব ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এই ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারছেন। মূল্যায়ন করতে হলে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ই-মেইল দিয়ে নিবন্ধন করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা শুধু নিজ বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারছেন।

ডাকসুর সদস্যরা জানিয়েছেন, মূল্যায়নকারীর পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হচ্ছে। শিক্ষকদের পরিচয় ও নাম জানার সুযোগ ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়ে ৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ১১ হাজারের বেশি মূল্যায়ন দিয়েছেন। একজন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে একাধিক শিক্ষককে মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে।

মূল্যায়ন চূড়ান্ত নয়। আমরা আগেই ঘোষণা দিয়েছি যে এটি এখনো উন্নয়ন ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।

এস এম ফরহাদ, জিএস, ডাকসু

ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওয়েবসাইটের কোনো মূল্যায়ন চূড়ান্ত নয়। আমরা আগেই ঘোষণা দিয়েছি যে এটি এখনো উন্নয়ন ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।’ তিনি বলেন, তাঁরা এ উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করলে তাঁরা বন্ধ করে দেবেন।

যেসব শিক্ষক ট্রলের শিকার হচ্ছেন, তাঁদের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামি। গত শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর রেটিং নম্বর ছিল ৫-এর মধ্যে ১ দশমিক ৪৯। এই নম্বর ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইনে। পরে আরেকটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাঁর নম্বর ১ দশমিক ৮৩।

শেহরীন আমিন এ বিষয়ে শনিবার ফেসবুকে দীর্ঘ একটি পোস্ট দেন। তিনি লিখেছেন, শিক্ষক মূল্যায়ন নিয়ে তাঁর কোনো আপত্তি ছিল না। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর সুবাদে তিনি অনেকবার এর মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি কয়েকটি প্রশ্ন তোলেন।

প্রথম প্রশ্ন, যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রন্ধ্রে রন্ধ্রে রাজনীতি, সেখানে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন কীভাবে হবে? সব শিক্ষার্থী পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে মূল্যায়ন করবেন, সেটা কে নিশ্চিত করবে? দ্বিতীয় প্রশ্ন, অনেক শিক্ষার্থী যেখানে মূল্যায়নে অংশ নেননি, সেখানে এই মূল্যায়ন যথাযথ ও প্রতিনিধিত্বশীল কীভাবে হবে?

শেহরীন আমিন আরও লিখেছেন, তারপরও শিবির-সমর্থিত ডাকসু প্যানেলের এই উদ্যোগকে তিনি সাধুবাদ জানান। তবে যথাযথভাবে তৈরি না করে হুট করে ওয়েবসাইট চালু করে দেওয়ার কারণে অনেক ধরনের ‘ইস্যু’ হতে পারে।

ওয়েবসাইটে গতকাল শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রেটিং দেখানো বন্ধ করা হলেও সার্বিক একটি চিত্র ছিল। বিকেল চারটা পর্যন্ত পাঁচটির বেশি মূল্যায়ন পাওয়া ৮১৬ জন শিক্ষকের মধ্যে রেটিংয়ে ৪-৫-এর মধ্যে রয়েছেন ৩৪৭ জন শিক্ষক। ৩-৪ রেটিংয়ের মধ্যে রয়েছেন ২০৫ জন শিক্ষক। ২-৩ রেটিংয়ের মধ্যে রয়েছেন ১৫৫ জন। রেটিংয়ে ২-এর নিচে রয়েছেন ১০৯ জন শিক্ষক।

শিক্ষকদের ক্ষোভ

ডাকসু ওয়েবসাইটটি চালুর পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আপত্তি জানিয়েছিল। শিক্ষকেরাও ক্ষুব্ধ। বিভিন্ন দল ও মতের অনুসারী ১০ জন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিজেদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে তাঁরা আলোচনা করেছেন এবং বেশির ভাগ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, শিক্ষকদের অসম্মান করার জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কোন শিক্ষার্থী শিক্ষকদের মূল্যায়ন করছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষকেরা। তাঁদের মতে, ক্লাসে ঠিকমতো উপস্থিত থাকেন না, এমন শিক্ষার্থী যদি একজন শিক্ষককে মূল্যায়ন করেন, সেটা কি যৌক্তিক হবে? একজন শিক্ষার্থী সব শিক্ষকের কোর্স নেন না। ফলে একজনকে বিভাগের সব শিক্ষককে মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া ঠিক নয়।

শিক্ষক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে একটি ‘স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস’ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত শিক্ষক মূল্যায়নের ফল শিক্ষক, ডিন বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেখতে পারে; শিক্ষার্থী বা সাধারণ জনগণের জন্য তা উন্মুক্ত থাকে না।

ওয়েবসাইটে গতকাল শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রেটিং দেখানো বন্ধ করা হলেও সার্বিক একটি চিত্র ছিল। বিকেল চারটা পর্যন্ত পাঁচটির বেশি মূল্যায়ন পাওয়া ৮১৬ জন শিক্ষকের মধ্যে রেটিংয়ে ৪-৫-এর মধ্যে রয়েছেন ৩৪৭ জন শিক্ষক। ৩-৪ রেটিংয়ের মধ্যে রয়েছেন ২০৫ জন শিক্ষক। ২-৩ রেটিংয়ের মধ্যে রয়েছেন ১৫৫ জন। রেটিংয়ে ২-এর নিচে রয়েছেন ১০৯ জন শিক্ষক।

শিক্ষকেরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের (আইকিউএসি) উদ্যোগেই শিক্ষক মূল্যায়নের জরিপ ফরম তৈরি করা হয়েছে এবং সেই জরিপে শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে অংশগ্রহণের নির্দেশনাও আছে। সরকার পরিবর্তন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের রদবদলের কারণে কাজটি নতুন করে শুরু করা যায়নি।

২০২২ সালে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামালের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতির নীতিমালা করা হয়। পরে ২০২৪ সালে এ পদ্ধতির অংশ হিসেবে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) নামে একটি ওয়েবসাইটও করা হয়েছিল। সেখানে শিক্ষার্থীরা কয়েকটি শর্ত পূরণ করে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারতেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরুতে অন্তত ১৪টি বিভাগে শিক্ষক মূল্যায়ন চালু হয়েছিল। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ৮৪ বিভাগেই তা একযোগে চালুর কথা ছিল; পরে তা হয়নি।

ডাকসুর উদ্যোগে শিক্ষক মূল্যায়নব্যবস্থা চালুকে একটি রাজনৈতিক ‘স্টান্টবাজি’ হিসেবে দেখছেন শিক্ষক ও গবেষক আসিফ বিন আলী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এর মাধ্যমে আসলে ছাত্রনেতাদের ক্ষমতা দেখানো হলো, বার্তা দেওয়া হলো যে তাঁরা চাইলেই অনেক কিছু করতে পারেন। তিনি বলেন, মানোন্নয়নের উদ্দেশ্যে মূল্যায়ন করা হলে সেটা যথাযথ প্রক্রিয়ায় হতো। সে ধরনের উদাহরণও আছে। এ ধরনের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পেশাগত ও তথ্যগত গোপনীয়তা রক্ষা করা হয় এবং সেই মূল্যায়ন শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়।

আসিফ বিন আলীর মতে, শিক্ষকদের মূল্যায়ন অবশ্যই দরকার। তবে তা একাডেমিক প্রক্রিয়ার ভেতরে যথাযথ সম্মান রেখেই হতে পারে। শিক্ষক মূল্যায়নের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি রয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়কেই নিতে হবে।

মূল্যায়নে আমি কত পেয়েছি, তা আমার সহকর্মীও জানতে পারবেন না।

মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়ায় সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ এরশাদুল করিম

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্য দেশে কী হয়

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক মূল্যায়নব্যবস্থা রয়েছে। যেমন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষক মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক। তবে কোন শিক্ষক কত নম্বর পেলেন, তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানতে পারে।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষকদের মূল্যায়নের পদ্ধতি আন্তর্জাতিক অনুশীলনের অংশ এবং এটি উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো ক্যাম্পাসের নিউরোসায়েন্সেস বিভাগে কর্মরত গবেষক নাদিম মাহমুদ প্রথম আলোকে জানান, সেখানে শুরুতে শিক্ষক নিয়োগ করা হয় একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য। মেয়াদ শেষে তাঁর পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যান্য বিবেচ্য বিষয়ের একটি শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন। তিনি বলেন, এই মূল্যায়নের আয়োজন ছাত্রসংসদ করে না। মূল্যায়নের ফল প্রকাশ্যে আসে না।

মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়ায় কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের লম্বা একটি মূল্যায়ন ফরম পূরণ করতে হয়। সেখানে শিক্ষকদের সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দেন শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন ও উদীয়মান প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ এরশাদুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মূল্যায়নে আমি কত পেয়েছি, তা আমার সহকর্মীও জানতে পারবেন না।’

আমরা শিক্ষক মূল্যায়নের পক্ষে; কিন্তু সেই কাজ ডাকসু করবে না। এটা ডাকসুর এখতিয়ারে নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী

নানা উদ্যোগ ও তৎপরতা

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, তদন্ত কমিটি গঠন এবং অভিযুক্ত শিক্ষকদের তালিকা তৈরির ঘটনা বেড়েছে। সর্বশেষ ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে ‘গোপন তৎপরতায়’ জড়িত শিক্ষকদের শনাক্ত করতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ অনুযায়ী, এমন তৎপরতায় দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক যুক্ত বলে দাবি করা হচ্ছে।

দুই বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ৩২ জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখাসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের ২৩১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে শিক্ষকদেরই একটি পক্ষ। এ ছাড়া ‘গোপন তৎপরতায় লিপ্ত’ থাকার অভিযোগে শিক্ষকদের বিষয় খতিয়ে দেখতে ১৩ আগস্ট তিন সদস্যের কমিটি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ১৫ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এসব উদ্যোগ ও তৎপরতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে পক্ষ–বিপক্ষ রয়েছে। তবে আলাপে শিক্ষকেরা বলছেন, শিক্ষক মূল্যায়নে ডাকসুর ওয়েবসাইট নিয়ে আপত্তি প্রায় সব শিক্ষকেরই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা শিক্ষক মূল্যায়নের পক্ষে; কিন্তু সেই কাজ ডাকসু করবে না। এটা ডাকসুর এখতিয়ারে নেই।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের শৃঙ্খলা রক্ষায়, শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা যেন তাদের মতামত সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারে-সেই ব্যবস্থাও আমরা করছি। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন।’

অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী বলেন, ‘ডাকসুর কাজটি শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেক শিক্ষক আমাদের অভিযোগ জানাচ্ছেন; মৌখিকভাবে জানাচ্ছেন, ফোনে জানাচ্ছেন, আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসে জানাচ্ছেন। শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার একটা বিশাল সুযোগ এখানে তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।’

Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *