রবিবার, ১০ মে, ২০২৬
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন পুরো শহরে এমন ১৪১ টি স্থান চিহ্নিত করেছে, যেগুলো আসন্ন বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে তারা।
স্থানগুলোর মধ্যে ১০৮টি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এবং ৩৩টি অবস্থিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায়।
তবে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, খাল সংযোগ পুনরুদ্ধার, রক্ষণাবেক্ষণের উন্নতি এবং একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া শহরের পানি নিষ্কাশন সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ ফজলে রেজা সুমন বলেন, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের নিষ্কাশন খাল এবং প্রধান নির্গমন পথের মধ্যে সংযোগের অভাবই সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দেখা গেছে।
তিনি বলেন, “সব পানিকে এগুলোর প্রাথমিক প্রবাহস্থলে প্রবাহিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজনীয় সংযোগ ব্যবস্থা এখনও সঠিকভাবে কাজ করছে না।”
তার মতে, পুনরুদ্ধার করা কিছু নিষ্কাশন সংযোগ আবারও দখলের শিকার হয়েছে, এবং কিছুটা উন্নয়ন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শহরের অনেক উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বৃষ্টিপাত ৮০ মিলিমিটারের বেশি হলে নিষ্কাশন ব্যবস্থা কষ্টকর হয়ে যেতে পারে এবং ভারী বর্ষণে কিছু এলাকা মারাত্মক বন্যার সম্মুখীন হতে পারে।
নগর বিশেষজ্ঞ এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেছেন, বারবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো সত্ত্বেও ঢাকার খাল, নালা এবং স্থানীয় পয়ঃনিষ্কাশন লাইনগুলো জ্যাম হয়ে থাকছে বর্জ্যের কারণে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ প্ল্যানারস-এর প্রাক্তন সভাপতি আদিল বলেন, “সিটি কর্পোরেশনগুলো প্রকল্প ও বিনিয়োগ নিয়ে কথা বলেই চলেছে, কিন্তু এলাকাভিত্তিক মূল্যায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার এখনও অভাব রয়েছে।”
তিনি বলেন, এ বছর অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই ধানমন্ডি লেকের কাছে পানি জমে যাওয়ায় শহরজুড়ে স্থানীয় জলাবদ্ধতা একটি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এটি পয়ঃনিষ্কাশন নকশা এবং পানি প্রবাহ ব্যবস্থার ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়।
আদিল দুটি সিটি কর্পোরেশনের পৃথক পদ্ধতির পরিবর্তে একটি সমন্বিত পয়ঃনিষ্কাশন মহাপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন।
তিনি নর্দমায় আবর্জনা ফেলা প্রতিরোধে জনসচেতনতা এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ডিএসসিসি-র সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার ড. মোহাম্মদ শফিউল্লাহ বলেন, কর্পোরেশন ৩৩টি হটস্পট এলাকা চিহ্নিত করেছে এবং এর প্রকৌশল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগকে নিয়ে ওয়ার্ড-ভিত্তিক জরুরি প্রতিক্রিয়া দল গঠন করা হয়েছে।
শফিউল্লাহ বলেন, নিউ মার্কেট, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট, বকশীবাজার, চানমারী মোড়, রাজারবাগ ও ফকিরাপুলসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা মোকাবেলায় কর্পোরেশন এ বছর অস্থায়ী পাম্পের সংখ্যা দুই থেকে বাড়িয়ে আটে উন্নীত করেছে।
তিনি আরও বলেন, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পাশাপাশি নর্দমা পরিষ্কারের কাজে ঠিকাদারদেরও নিযুক্ত করা হয়েছে।
শফিউল্লাহ বলেন, বিডিআর এলাকার একটি নির্গমন পথ বন্ধ করে দেওয়ায় নিউ মার্কেট ও মিরপুর রোডের জলাবদ্ধতার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে, যার ফলে পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে পানি নিষ্কাশনের গতি কমে গেছে।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য ধানমন্ডি, নিউ মার্কেট ও বকশীবাজার এলাকায় নর্দমা সংযোগ ব্যবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে ২৫০-৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছে ডিএসসিসি।
তিনি বলেন, “প্রস্তাবটি বাজেট বরাদ্দের জন্য ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলে এটি একটি স্থায়ী সমাধান দিতে পারে।”
প্রকল্পের পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে রয়েছে নদীর দিকে নর্দমার মুখ সম্প্রসারণ এবং সদরঘাট ও চকবাজারের মতো এলাকার মধ্য দিয়ে একাধিক নিষ্কাশন পথ তৈরি করা।
জিরানি, কালুনগর, হাজারিবাগ ও শ্যামপুর এলাকায় খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্প নিয়েও কাজ করছে ডিএসসিসি।
এদিকে, ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান বলেন, কর্পোরেশন বর্তমানে ২৯টি খালের তত্ত্বাবধান করে, কিন্তু এই বর্ষায় জরুরি হস্তক্ষেপের জন্য পাঁচটি খাল এবং মিরপুর এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
আওতাভুক্ত খালগুলোর মধ্যে রয়েছে সংবাদিক খাল, বাউনিয়া খাল, ২২-ফুট খাল, রামচন্দ্রপুর খাল, টোলারবাগ খাল এবং কল্যাণপুর খাল।
রাকিবুল বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো মিরপুরকে যতটা সম্ভব বন্যা-মুক্ত অবস্থায় নিয়ে আসা।”
তিনি বলেন, ডিএনসিসির লক্ষ্য হলো ভারী বৃষ্টিপাতের পর এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে লক্ষ্যভুক্ত এলাকাগুলোতে জমে থাকা পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা।
প্রধান প্রকৌশলীর মতে, কল্যাণপুর ও টোলারবাগ এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও খনন কাজ চলছে এবং কাদা ও আবর্জনা জমা রোধ করতে কর্মীদের ধারাবাহিকভাবে সক্রিয় রাখা হয়েছে।
তিনি স্বীকার করেন যে বক্স কালভার্ট পরিষ্কার করা এখনও কঠিন ও বিপজ্জনক, যার ফলে ডিএনসিসি ভবিষ্যতে রোবোটিক বা যান্ত্রিক পরিচ্ছন্নতা সরঞ্জাম ব্যবহারের কথা বিবেচনা করছে।
তবে তিনি বলেন, দখলকৃত খাল, জলাভূমি এবং সঠিক নিষ্কাশন পথের অভাবে আশকোনা, দক্ষিণখান ও উত্তরখানসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় তীব্র নিষ্কাশন সমস্যা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, “এই জায়গাগুলোর অনেকগুলোতে পানি যাওয়ার কোনো পথই নেই।”
রাকিবুল বলেন, সঠিক নকশা ও বিন্যাস অনুযায়ী খাল পুনরুদ্ধারসহ দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প প্রয়োজন।
“আমরা চিরকাল অস্থায়ী পদ্ধতি নিয়ে চলতে পারি না। খাল নেটওয়ার্কের স্থায়ী পুনরুদ্ধার প্রয়োজন,” যোগ করেন তিনি।
