বয়ঃসন্ধিকালে শিশুর লালন-পালনে ইসলামের যে নির্দেশনাগুলো মেনে চলবেন

২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইসলামে সন্তান প্রতিপালনকে শুধু দুনিয়াবি দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়নি; বরং ঈমান, ইবাদত, চরিত্র ও নৈতিকতার শিক্ষা দিয়ে তাকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে হজরত লুকমান (আ.)-এর সন্তানকে দেওয়া উপদেশগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। সেখানে তিনি সন্তানকে তাওহিদ, নামাজ, সৎকাজ, অন্যায় থেকে বিরত থাকা, ধৈর্য, বিনয় ও উত্তম আচরণের শিক্ষা দিয়েছেন।

সত্যবাদিতা, আমানতদারি, দায়িত্বশীলতা, বড়দের সম্মান এবং ছোটদের প্রতি স্নেহ—এসব গুণ ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে। শুধু মুখে উপদেশ নয়, বাবা-মায়ের নিজেদের আচরণের মাধ্যমেও এসব মূল্যবোধ শেখানো জরুরি।

পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে,  ‘হে আমাদের প্রভু! আপনি তাদের মাঝে পাঠান এমন রাসুল, যিনি আপনার আয়াত উপস্থাপন করবেন, কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পবিত্র করবেন। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী স্নেহশীল ও কৌশলী।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৯)। 

কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, লুকমান (আ.) সন্তানকে বলেছেন, মানুষের কোনো কাজ অণু পরিমাণ হলেও আল্লাহ তা জানেন ও হিসাবের আওতায় আনবেন—এ শিক্ষা শিশুর মধ্যে জবাবদিহির অনুভূতি তৈরি করে।

কোরআন শিক্ষা দিন

বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানকে কোরআন পড়তে শেখান। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যে নিজে কোরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০২৭)

কোরআন শিখানোর সঙ্গে সঙ্গে এর অর্থ ও শিক্ষা বোঝার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে শিশুদের। নিয়মিত তিলাওয়াত, ছোট ছোট সূরার অর্থ শেখা এবং আয়াতের শিক্ষা দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।

নামাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করুন

বয়ঃসন্ধিকালে শিশুদের নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে বুঝান। রাসুল (সা.) এই বয়স থেকেই নামাজের প্রতি গুরুত্ব দিতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, তোমরা নিজেদের সন্তান-সন্ততিদেরকে নামাজের আদেশ দাও; যখন তারা সাত বছরের হবে। আর তারা যখন দশ বছরের সন্তান হবে, তখন তাদেরকে নামাজের জন্য প্রহার কর এবং তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫)

সুরা লুকমানে সন্তানকে নামাজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্ণিত হয়েছে, ‘হে আমার প্রিয় বৎস, সালাত কায়েম কর, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ কর এবং তোমার উপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধর। নিশ্চয় এগুলো অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ’। (সুরা লুকমান, আয়াত:১৭) 

নৈতিকতা শিক্ষা ও অন্যায় থেকে বিরত রাখার অন্যতম মাধ্যম হতে পারে নামাজ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা নামাজকে সবধরনের অন্যায় থেকে বিরত থাকার অন্যতম উপকরণ বলেছেন। বর্ণিত হয়েছে, নিশ্চয়ই সালাত অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে। (সুরা আনকাবূত, আয়াত : ৪৫)

মানবিক শিক্ষা দিন

নিজের অধিকারের বিষয়ে সচেতন করার পাশাপাশি সন্তানকে অন্যের অধিকার সম্পর্কেও সচেতন করতে হবে। দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতি, অসুস্থের খোঁজ নেওয়া, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রাণীর প্রতিও দয়া করার শিক্ষা দিতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের প্রতি গভীর স্নেহ ও মমতা প্রদর্শন করতেন। এক হাদিসে এসেছে, তিনি হজরত হাসান (রা.)-কে চুম্বন করলে এক ব্যক্তি বিস্ময় প্রকাশ করেন। তখন নবী (সা.) বলেন, যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না। (সহিহ বুখারি, ৫৯৯৭) 

শালীনতা রক্ষার বিষয়ে সচেতন করুন

বয়ঃসন্ধির সঙ্গে শারীরিক ও যৌন পরিবর্তন আসে। এ বিষয়গুলো নিয়ে সন্তানকে ভয় দেখানো বা লজ্জায় ফেলে না দিয়ে ইসলামের আলোকে শালীনতা, পর্দা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে আচরণের সীমারেখা বোঝানো প্রয়োজন।

বিশেষ করে ছেলে-মেয়েদের ব্যক্তিগত পরিসর ও ঘুমের ব্যবস্থা সম্পর্কে নবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন। সন্তানদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ে সচেতন করার বিষয়টি হাদিসে এসেছে।

এই বয়সে সন্তান কখনো চুপচাপ হয়ে যেতে পারে, আবার কখনো অতিরিক্ত স্বাধীনচেতা আচরণ করতে পারে। তার প্রতিটি পরিবর্তনকে অবাধ্যতা হিসেবে না দেখে কেন এমন হচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন এবং কথা বলার জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করুন।

ইসলামী শিক্ষাতেও সন্তানের প্রতি মমতা ও কোমল আচরণের গুরুত্ব স্পষ্ট। নবীজি (সা.) শিশুদের ভালোবাসতেন এবং তাদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ আচরণ করতেন। 

প্রয়োজনীয় শাসন চালু রাখুন

শিশুর মানসিকতা ও সামনের পথ চলা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বয়ঃসন্ধি। এই বয়সে তাকে বুঝার পাশাপাশি একেবারে  ছাড় না দিয়ে প্রয়োজনীয় শাসন চালু রাখুন।  তবে মনে রাখবেন শাসন মানে অপমান, ভয় দেখানো বা নির্যাতন নয়। বরং ভুলের পরিণতি বোঝানো এবং প্রয়োজন হলে যুক্তিসংগত উপায়ে সংশোধন করা উচিত।

সৎসঙ্গ গ্রহণ ও অসৎ সঙ্গ পরিহারে উদ্বুদ্ধ করুন

বয়ঃসন্ধিকালে বন্ধুদের প্রভাব অনেক বেড়ে যায়। তাই সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের পরিবেশে যাচ্ছে এবং অনলাইনে কাদের অনুসরণ করছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা দরকার। তবে অতিরিক্ত সন্দেহ বা গোয়েন্দাগিরির পরিবর্তে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করে ভালো বন্ধু নির্বাচনের কারণ বোঝাতে হবে।

জোর করে কিছু চাপিয়ে দেবেন না

ইসলামী শিক্ষা দিতে গিয়ে কেবল ভয় ও শাস্তির ভাষা ব্যবহার না করে ভালোবাসা, যুক্তি ও আল্লাহর রহমতের কথাও তুলে ধরতে হবে। সন্তান কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করলে তাকে থামিয়ে না দিয়ে তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। লুকমান (আ.)-এর উপদেশেও সন্তানের সঙ্গে সরাসরি ও আন্তরিকভাবে কথা বলার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়—তিনি বারবার ‘হে আমার প্রিয় সন্তান’ বলে সম্বোধন করেছেন। 

ধর্মীয় বিধি-নিষেধ সম্পর্কে সচেতন ও মানতে উৎসাহিত করুন

বয়ঃসন্ধিতে সন্তানকে নামাজ, রোজা, পবিত্রতা, পর্দা, হালাল-হারাম এবং অন্যান্য ইসলামী বিধান সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান দিতে হবে। শুধু ‘এটা হারাম’ বলার পরিবর্তে কেন কোনো বিষয় নিষিদ্ধ এবং এর মধ্যে কী কল্যাণ রয়েছে—তা উপযোগী ভাষায় বোঝানো বেশি কার্যকর।

ন্যায় ও অন্যায় সম্পর্কে সচেতন করুন

সন্তানকে ন্যায় অন্যায় সম্পর্কে সচেতন করুন এবং তাকে বুঝান কোন কাজটি ভালো এবং কোনটি মন্দ। মানুষ সাধারণত গোপনে অন্যায় করে এবং ভাবে কেউ দেখছে না, তাই অপরাধটি করাই যায়। তাই সন্তানকে বোঝাতে হবে, মানুষের চোখ এড়িয়ে গেলেও আল্লাহর কাছ থেকে কোনো কিছু গোপন থাকে না। ভালো কাজের পুরস্কার এবং অন্যায়ের পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতা তাকে আত্মনিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে। 

Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *