নবীজি (সা.)-এর নির্মল তারুণ্য

 রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬

মানুষের জীবনে তারুণ্য এমন এক সময়, যখন শক্তি থাকে, স্বপ্ন থাকে, উদ্দীপনা থাকে; আবার থাকে প্রবৃত্তির টান, আবেগের তীব্রতা এবং নিজেকে প্রমাণ করার অদম্য আকাক্সক্ষা। যৌবনের এই উচ্ছ্বাস মানুষকে যেমন মহৎ কাজের দিকে এগিয়ে নিতে পারে, তেমনি লাগামহীন হলে তাকে পাপ, প্রবৃত্তি ও আত্মবিস্মৃতির অন্ধকারেও ডুবিয়ে দিতে পারে। তাই কোনো মানুষের চরিত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য বোঝার জন্য তার তারুণ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই দিক থেকে রসুল (সা.)-এর তারুণ্য মানবজাতির জন্য এক অনন্য আদর্শ। নবুয়ত লাভের আগের জীবনও ছিল তাঁর পবিত্রতা, সততা, সংযম, দায়িত্ববোধ ও আত্মমর্যাদায় উজ্জ্বল। তিনি যে সমাজে বেড়ে উঠেছিলেন, সেখানে অশ্লীলতা, মদ্যপান, জুয়া, গোত্রীয় অহংকার, নারীর প্রতি অবিচার এবং নানা ধরনের নৈতিক অবক্ষয় ছিল ব্যাপক। কিন্তু সেই পরিবেশ তাঁর নির্মল চরিত্রকে কলুষিত করতে পারেনি। বরং তিনি এমন এক জীবন গড়ে তুলেছিলেন, যার কারণে নবুয়ত লাভের আগেই মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ অর্থাৎ বিশ্বস্ত ও আমানতদার বলে চিনত।

শৈশবেই রসুল (সা.) পিতাকে হারান। এরপর মা, দাদা এবং পরে চাচার স্নেহ-সান্নিধ্যে তিনি বড় হন। জীবনের শুরুতেই নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু এসব তাঁর ব্যক্তিত্বকে দুর্বল করেনি; বরং তাঁকে আরও দায়িত্বশীল ও আত্মনির্ভরশীল করে তুলেছিল। কৈশোরে তিনি মেষপালনের কাজ করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ এমন কোনো নবী প্রেরণ করেননি, যিনি মেষ চরাননি।’ সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনিও কি?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমিও মক্কাবাসীদের মেষ কয়েক কিরাতের বিনিময়ে চরাতাম’ (বুখারি)।

তারুণ্যের এই সম্ভাবনাময় সময়টুকু আমরা অনর্থক আনন্দ-ফুর্তি, উচ্ছলতা আর হেঁয়ালিপনায় কাটিয়ে দিই। অথচ এটি হেঁয়ালিপনার বয়স নয়। জীবন গড়ার বয়স। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) এর তারুণ্য ছিল কর্মমুখর ও নিষ্কলুষ। বর্তমানের এই অবক্ষয়িত সময়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য নবীজি (সা.)-এর সেই সোনালি দিনগুলো হতে পারে এক অনন্য পাথেয়।

নবীজি (সা.)-এর তারুণ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর সমাজসেবামূলক মানসিকতা। কেবল নিজের ইবাদত নিয়ে তিনি মগ্ন থাকতেন না, বরং সমাজের আর্তমানবতার সেবায় তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। কৈশোরে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন ‘হিলফুল ফুজুল’ শান্তিসংঘে। একদল উদ্যমী যুবককে নিয়ে তিনি শপথ করেছিলেন-মক্কায় কোনো মজলুম অত্যাচারিত হবে না এবং বহিরাগত কোনো ব্যবসায়ী যেন প্রতারিত না হন, তা নিশ্চিত করা হবে। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা যখন সামাজিক অস্থিরতা দেখি, তখন নবীজি (সা.)-এর সেই তরুণ বয়সের সমাজসংস্কারমূলক কাজগুলো আমাদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে।

মুহাম্মদ (সা.)-এর তরুণ জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ন্যায়নিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হাজরে আসওয়াদ বা পবিত্র কালোপাথর স্থাপন নিয়ে যখন মক্কার গোত্রগুলোর মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের উপক্রম হয়েছিল, তখন টগবগে যুবক মুহাম্মদ (সা.) তাঁর প্রজ্ঞা ও মেধা দিয়ে এক চমৎকার সমাধান বের করেছিলেন। তাঁর সেই ইনসাফপূর্ণ সিদ্ধান্তে একটি নিশ্চিত রক্তপাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল আরবের বহু প্রাণ। এটি প্রমাণ করে, তিনি কেবল সৎ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ দূরদর্শী নেতা।

পেশাগত জীবনেও তাঁর নির্মলতা ছিল উদাহরণ দেওয়ার মতো। বিবি খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসায়িক কাফেলার দায়িত্ব নিয়ে যখন তিনি সিরিয়া যান, তখন তাঁর সততা ও ব্যবসায়িক দক্ষতা দেখে সবাই বিস্মিত হয়। তিনি কখনো বেশি মুনাফার জন্য মিথ্যা বা প্রতারণার আশ্রয় নেননি। তাঁর এই স্বচ্ছতায় মুগ্ধ হয়েই খাদিজা (রা.) তাঁর কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। অর্থাৎ নবুয়ত পাওয়ার আগে থেকেই তাঁর নির্মল চরিত্র মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসার বীজ বপন করেছিল। আজ আমরা যখন কর্মক্ষেত্রে সততার সংকট দেখি, তখন নবীজি (সা.)-এর তারুণ্যের এই আদর্শ আমাদের পথ দেখায়।

আজকের এই আধুনিক পৃথিবীতে তারুণ্য যখন নেশা, হতাশা আর নৈতিক স্খলনের চোরাবালিতে নিমজ্জিত, তখন নবীজি (সা.)-এর নির্মল যৌবন আমাদের জন্য এক আলোর মিনার। আমরা যদি সুন্দর ও সার্থক জীবন গড়তে চাই, তবে তার তারুণ্যকে আমাদের আয়নায় পরিণত করতে হবে। যে তারুণ্য ছিল মিথ্যামুক্ত, যে যৌবন ছিল পরোপকারে নিবেদিত এবং যে জীবন ছিল আল্লাহর ভয়ে সদা জাগ্রত। নবীজি (সা.)-এর সিরাত চর্চার মাধ্যমেই আমরা খুঁজে পাব সেই অমলিন পথের দিশা, যা আমাদের ইহকাল ও পরকালে মুক্তি দেবে। মহান আল্লাহ আমাদের নবীজি (সা.)-এর সেই পবিত্র তারুণ্যের আদর্শ নিজেদের জীবনে প্রতিফলিত করার তৌফিক দান করুন।

Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *