শিরোনাম

কক্সবাজারে এবার চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু

রবিবার, ০৫ জুলাই, ২০২৬

কক্সবাজারে সংক্রামক রোগ হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসলেও এরই মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ বাড়তি সতর্কতা জারি করেছে। 

কক্সবাজারে হাম উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ জনে, যার মধ্যে তিনটি রোহিঙ্গা শিশু।

শনিবার (৪ জুলাই)  কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সর্বশেষ ৪ জুলাই মারা যাওয়া শিশু আরফান (১৩ মাস) উখিয়ার একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা নবী হোছনের ছেলে।

কক্সবাজার  সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় মোট ১৮০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। ২৪ ঘন্টায় বর্তমানে ২০ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩ জন রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। একই সময়ে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন আরও পাঁচজন। নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে চারজনই উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা এবং একজন মহেশখালীর বাসিন্দা।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা পঙ্কজ পাল জানান, চলতি বছর ১০ টি উপজেলায় ১৮০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি। 

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, কক্সবাজার জেলার স্থানীয় জনগণের তুলনায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেই ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৪৭৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও এখন পর্যন্ত ক্যাম্পে ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যাম্পে ঘনবসতি, বর্ষার সময় জমে থাকা পানি এবং পরিবেশগত নানা কারণে এডিস মশার বিস্তারের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। তাই সেখানে নিয়মিত নজরদারি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।

কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

তিনি জানান, ইতোমধ্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক র‌্যালি, লিফলেট বিতরণ, প্রচারণা এবং জনসচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এই কার্যক্রম বিস্তৃত করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে বিশেষ কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সংক্রামক রোগ ও ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান নাজির জানান, ডেঙ্গু একটি এডিস মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। এর প্রধান লক্ষণ হলো উচ্চমাত্রার জ্বর, যা ৯৯ থেকে ১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে। জ্বর টানা থাকতে পারে, আবার ঘাম দিয়ে কমে গিয়ে পুনরায়ও আসতে পারে।

তিনি বলেন, জ্বরের পাশাপাশি শরীরব্যথা, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমিভাব এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, “অনেকেই জ্বর হলে পাশের ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খেয়ে থাকেন। এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ডেঙ্গু হলে অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কারণ ভুল ওষুধ বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে কিছু ব্যথানাশক ওষুধ সেবনে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।”

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, মশা পরিষ্কার ও স্থির পানিতে জন্মায়। তাই বাড়ির আঙিনা, ছাদ, ফুলের টব, নারিকেলের খোসা, ভাঙা পাত্র, টায়ার কিংবা যেকোনো স্থানে দুই থেকে তিন দিন পরিষ্কার পানি জমে থাকলে সেখানে মশার লার্ভা জন্মাতে পারে।

নিয়মিত বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। পানি জমতে দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি দিনের বেলায়, বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে এডিস মশার কামড় থেকে বাঁচতে সতর্ক থাকতে হবে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মশারি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া ঘরের দরজা-জানালায় নেট ব্যবহার এবং মশা প্রবেশের সুযোগ কমিয়ে আনারও আহ্বান জানান স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *