শি-ট্রাম্প বৈঠকের চার গুরুত্বপূর্ণ দিক

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার বিরোধের বিষয়গুলো অনেকটাই আড়ালে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে শি’র তিন দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে দুই নেতা বৈঠক করেন। পরে শি হোয়াইট হাউসও ঘুরে দেখেন।

বৈঠক শেষে ট্রাম্প একে ‘দারুণ বৈঠক’ বলে অভিহিত করেন। ইরান, তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মতপার্থক্য থাকলেও ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সংলাপ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

ট্রাম্প বলেন, “২০১৬ সালে আমার প্রথম নির্বাচনের সময় থেকে প্রেসিডেন্ট শি এবং আমি একটি বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছি- সত্যিই দারুণ একটি বন্ধুত্ব, যা পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আমাদের জনগণের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত।”

শি’র যুক্তরাষ্ট্র সফরের দ্বিতীয় দিনের ঘটনাপ্রবাহে চারটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

স্থিতিশীল সম্পর্কের ওপর জোর
ট্রাম্প দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর চীনা পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেছিলেন। এর জেরে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে দ্রুত বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর আরও বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।

তবে সেই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার চেষ্টা করছেন ট্রাম্প ও শি। দুই নেতা ব্যক্তিগত সম্পর্কও উন্নত করার চেষ্টা করছেন। যদিও উভয় পক্ষই জানে, দুই দেশের মৌলিক মতপার্থক্যের অনেকগুলোই সহজে দূর হওয়ার নয়।

চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তিকে কখনও কখনও প্রশংসার চোখেও দেখেছেন ট্রাম্প। তবে একই সঙ্গে এই উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের প্রতিযোগিতাও বাড়িয়ে তুলেছে।

বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “আমাদের একটি দারুণ বৈঠক হয়েছে।” তবে বৈঠকের বিস্তারিত তিনি জানাননি।

অন্যদিকে শি দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ থেকে বেরিয়ে আসার ওপর জোর দেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় এই শব্দটি ব্যবহার করা হয় কোনও উদীয়মান শক্তির সঙ্গে বিদ্যমান প্রভাবশালী শক্তির সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বোঝাতে।

শি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত, যেখানে উভয় দেশ একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে; এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, যেখানে একজনকে জিততে হলে অন্যজনকে হারতেই হবে।

তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন গভীরভাবে পরস্পরনির্ভরশীল। তাই দুই দেশের উচিত ‘স্বাস্থ্যকর’ প্রতিযোগিতায় যুক্ত থাকা, তবে সেই প্রতিযোগিতারও নির্দিষ্ট সীমা থাকা প্রয়োজন।

বৈঠকের ওপর ছায়া ফেলেছে ইরান যুদ্ধ
শি’র যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রধান লক্ষ্য ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা হলেও বৈঠকের আলোচনায় ইরান যুদ্ধও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ইরান যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।

ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন প্রচেষ্টায় চীনের সহযোগিতা চেয়েছেন। কিন্তু ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন এ বিষয়ে সরাসরি জড়াতে এখনও অনাগ্রহী।

বৃহস্পতিবার ট্রাম্প-শি বৈঠকে ইরান ইস্যুতে বড় কোনও অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি। শি অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আগের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে তিনি সমর্থন করেন।

ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল পরবর্তী সময়ে একটি বৃহত্তর শান্তিচুক্তির পথ তৈরি করা। তবে জুনে চুক্তিটি ঘোষণার কিছুদিন পরই তা ভেঙে পড়ে।

শি’র সফর নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
শি’র যুক্তরাষ্ট্র সফরে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন থাকলেও দেশটির আইনপ্রণেতাদের একাংশ এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের প্রেসিডেন্টকে এভাবে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো উচিত হয়নি।

রিপাবলিকান সিনেটর রজার উইকার বলেন, প্রেসিডেন্টের কাছে পরামর্শ চাওয়া হলে তিনি শিকে এতটা জাঁকজমকপূর্ণভাবে ওয়াশিংটনে আমন্ত্রণ না জানানোর পরামর্শ দিতেন। চীনের প্রেসিডেন্ট এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অনেক উদ্বেগজনক বিষয়’ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেনও একই ধরনের সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, ট্রাম্প কর্তৃত্ববাদী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে নিজের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে বলে বারবার ভুল ধারণা পোষণ করেন।

তবে সবাই যে শি’র সফরকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন, তা নয়। কয়েকজন মার্কিন আইনপ্রণেতার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংলাপ সম্ভাব্য বড় সংঘাত এড়াতে সহায়ক হতে পারে।

রিপাবলিকান সিনেটর র‌্যান্ড পল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, তিনি এই বৈঠককে স্বাগত জানাচ্ছেন। তার বক্তব্য, “কূটনীতিই গুরুত্বপূর্ণ- আরও কথা বলুন, যুদ্ধ কমান।”

তাইওয়ান ইস্যুতে ট্রাম্পকে সতর্ক করলেন শি
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি তাইওয়ান। স্বশাসিত এই দ্বীপকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চীন। অন্যদিকে তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে শি তাইওয়ানের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান না নিতে এবং এ বিষয়ে ‘সতর্কতার সঙ্গে’ পদক্ষেপ নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আহ্বান জানিয়েছেন বলে চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে।

তবে বৈঠক নিয়ে হোয়াইট হাউস রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নিজস্ব বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেনি। ফলে তাইওয়ান নিয়ে ট্রাম্প-শি’র আলোচনায় ঠিক কী ধরনের মতবিনিময় হয়েছে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়নি।

তবে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে এ ধরনের বার্তা দেওয়ার ঘটনা থেকে বোঝা যায়, তাইওয়ান ইস্যুতে চীন তার অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে চাইছে।

এর আগে মে মাসে শি’র সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প তাইওয়ানের জন্য ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজের চূড়ান্ত অনুমোদন পিছিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি চীনের সঙ্গে আলোচনায় অস্ত্র বিক্রিকে ‘খুব ভালো দর-কষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবেও অভিহিত করেছিলেন।

ট্রাম্পের এই লেনদেননির্ভর বা দর-কষাকষিভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ওয়াশিংটনের কিছু মহলে অসন্তোষ তৈরি করেছে। তাদের মতে, তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেশটির দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অঙ্গীকার।

তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবেই বেইজিং ও তাইপের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী নীতি অনুসরণ করে এসেছে। চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে উঠে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াশিংটন বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কও জোরদার করেছে। পাশাপাশি তাইওয়ান প্রণালির বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের পক্ষে অবস্থান বজায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।

তাইওয়ানের আশঙ্কা, চীন অর্থনৈতিক ও সামরিক- দুই ধরনের চাপ প্রয়োগ করে দ্বীপটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

মে মাসে দ্য ইকোনমিস্ট ও ইউগভের পরিচালিত এক জরিপেও তাইওয়ান নিয়ে মার্কিন জনমতের বিভাজন উঠে আসে। জরিপে দেখা যায়, চীনের তুলনায় তাইওয়ানকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে বেশি।

চীনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা নাকি চীনকে তাইওয়ান দখল করা থেকে ঠেকানো- কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, এমন প্রশ্নে ৩৬ শতাংশ উত্তরদাতা চীনের সঙ্গে ভালো সম্পর্কের পক্ষে এবং ৩৫ শতাংশ তাইওয়ানকে চীনের নিয়ন্ত্রণে যাওয়া ঠেকানোর পক্ষে মত দেন।

তবে ৪০ শতাংশেরও কম উত্তরদাতা মনে করেন, তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ চীন নিয়ে নিলে তা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্প-শি বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ককে আপাতত সংঘাতের বদলে সংলাপের পথে রাখার ইঙ্গিত দিলেও ইরান, তাইওয়ান, বাণিজ্য ও এআইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মৌলিক মতপার্থক্য এখনও রয়ে গেছে। ফলে দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের উষ্ণতা বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার কৌশলগত বাস্তবতা খুব দ্রুত বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। 

Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *