শনিবার, ০২ মে, ২০২৬
লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি তেল পাম্পে নিজের পিকআপ ট্রাকে তেল ভরছিলেন ২৮ বছর বয়সী রাইডার থমাস। চোখেমুখে তার চাপা উত্তেজনা আর ক্ষোভ। পুরো ট্যাংক পূর্ণ করতে তার খরচ হয়েছে ১৩০ ডলার, যা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের আগের তুলনায় ৩০ ডলার বেশি।
ক্ষুব্ধ থমাস সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “তেলের দামে আমি যেমন ক্ষিপ্ত, কেন এ দাম বাড়ছে তা নিয়ে তার চেয়েও বেশি রাগান্বিত। ট্রাম্প একজন নির্বোধ, এছাড়া আর কিছুই নয়।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যৌথভাবে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তাৎক্ষণিকভাবে ইরানও পাল্টা হামলা শুরু করে। জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় ভয়াবহ হামলা চালায় ইরানি বাহিনী। এতে অগ্নিগর্ভে পরিণত হয় গোটা মধ্যপ্রাচ্য। সেই সঙ্গে বন্ধ করে দেয় বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী। এতে গোটা বিশ্বে জ্বালানি অস্থিরতা দেখা দেয়।
টানা ৩৯ দিন যুদ্ধ শেষে দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গত ৮ এপ্রিল থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
১১ এপ্রিল পাকিস্তানের ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনায় বসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সেই আলোচনা ব্যর্থ হয়।
সাময়িক ওই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলে এক রকম একক সিদ্ধান্তেই অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে আবারও আলোচনায় বসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ইরান দ্বিতীয় দফায় আলোচনায় বসতে রাজি হয়নি।
শান্তি আলোচনা ব্যাহত হওয়ায় হু হু করে বাড়ছে অপরিশোধিত তেলের দাম। ট্রাম্পের শুরু করা এ যুদ্ধের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের কাছে ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জনমত জরিপ বলছে, অধিকাংশ মার্কিনই এ যুদ্ধকে সমর্থন করছেন না।
থমাসের মতে, “এ যুদ্ধের কোনও দরকারই ছিল না। এটি ঠিক ইরাক আক্রমণের মতো, যেখানে শেষ পর্যন্ত কোনও গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায়নি।”
ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে এ হামলা জরুরি ছিল এবং এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তবে মার্কিন চাপের মুখেও ইরান বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দিয়েছে।
বিশ্বের মোট তেল–গ্যাসের এক–পঞ্চমাংশ এ পথ দিয়েই সরবরাহ করা হয়। সরবরাহ কমায় ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রতি গ্যালন তেলের দাম ৬ ডলার (লিটারপ্রতি ১ দশমিক ৫৯ ডলার) ছাড়িয়েছে, যা যুদ্ধের আগে ছিল সাড়ে ৪ ডলার।
জ্বালানির এ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে খাদ্য ও পোশাকসহ নিত্যপণ্যের দামও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ। তেলের পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ডেভিড চাভেজ নামের এক ক্যামেরাপারসন অবশ্য পরিস্থিতির জন্য সরাসরি কাউকে দায়ী করতে নারাজ। সাবেক ডেমোক্র্যাট সমর্থক চাভেজ অভিবাসন ও অর্থনীতি ইস্যুতে জো বাইডেনের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে গত নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন।
চাভেজ মনে করেন, তেল কোম্পানিগুলো কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনিও ট্রাম্পের ওপর কিছুটা হতাশ।
জ্বালানি তেলের এ লাগামহীন দামের প্রভাব পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায়। তেলের দাম দিতে গিয়ে অনেককে এখন টান দিতে হচ্ছে খাবারের বাজেটে। ৭৩ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত নারী ফ্লো জানান, চড়া দামের কারণে এখন তাকে গাড়ি চালানো কমাতে হয়েছে। পেনশনের সামান্য টাকা দিয়ে ঘরভাড়া দেওয়ার পর হাতখরচ চালানোও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফ্লো বলেন, “জীবন তো আগে থেকেই কঠিন ছিল, এখন তা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে |
