রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬
চ্যাম্পিয়নশিপের মৌসুমজুড়ে চলা রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের যবনিকা পড়ল এক মহানাটকীয় শেষ দিনে। কুইন্স পার্ক রেঞ্জার্সের বিপক্ষে দাপুটে জয়ে ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষ স্তর প্রিমিয়ার লিগে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছে ইপসউইচ টাউন। একই দিনে প্লে-অফের টিকিট কাটার লড়াইয়ে শেষ হাসি হেসেছে হাল সিটি।
মৌসুমের শেষ ম্যাচে ঘরের মাঠে ইপসউইচের সমীকরণ ছিল পরিষ্কার—জয় পেলেই নিশ্চিত হবে প্রিমিয়ার লিগ। স্নায়ুচাপের এই ম্যাচে শুরুর নয় মিনিটেই প্রতিপক্ষকে ধসিয়ে দেয় তারা। জর্জ হার্স্ট ও জ্যাডন ফিলোমিনের জোড়া গোলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ শুরুতেই ইপসউইচের হাতে চলে আসে। ম্যাচ শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে ক্যাসি ম্যাকাটিয়ার দলের হয়ে তৃতীয় গোলটি করলে গ্যালারিতে শুরু হয় আগাম উদযাপনের উৎসব।
ইপসউইচের এই সাফল্যের রূপকার হিসেবে আবারও নাম লিখিয়েছেন কোচ কিয়েরান ম্যাককেনা। প্রথম ম্যানেজার হিসেবে ইপসউইচকে তিনবার পদোন্নতি (প্রমোশন) এনে দেওয়ার রেকর্ড গড়লেন তিনি, যার মধ্যে দুবারই ছিল প্রিমিয়ার লিগে ওঠার গৌরব।
পয়েন্ট টেবিলের সমীকরণ ছিল বেশ কঠিন। মিলওয়াল ও মিডলসবরো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইপসউইচের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছিল। মিলওয়াল তাদের ম্যাচে অক্সফোর্ডকে ২-০ গোলে হারালেও মিডলসবরো ২-২ গোলে ড্র করে রেক্সহ্যামের সঙ্গে। ফলে ১ পয়েন্টের ব্যবধানে টেবিলের দ্বিতীয় দল হিসেবে সরাসরি প্রিমিয়ার লিগে উঠে গেল ইপসউইচ।
এর আগে ২০২৪-২৫ মৌসুমে দীর্ঘ ২২ বছর পর প্রিমিয়ার লিগে ফিরেছিল ক্লাবটি। কিন্তু সেই যাত্রা সুখকর ছিল না। মাত্র ৪টি জয় আর ২২ পয়েন্ট নিয়ে অবনমিত হয়ে তারা আবারও চ্যাম্পিয়নশিপে নেমে যায়। এরপরই শুরু হয় দল পুনর্গঠনের কাজ। গত দুই মৌসুমের প্রমোশনে বড় ভূমিকা রাখা লিয়াম ড্যাপ ও ওমারি হাচিনসনের মতো তারকাদের মোটা অঙ্কের বিনিময়ে যথাক্রমে চেলসি ও নটিংহ্যাম ফরেস্টের কাছে বিক্রি করে দেয় ক্লাব কর্তৃপক্ষ।
শূন্যস্থান পূরণে ১১ জন নতুন খেলোয়াড় দলে ভেড়ান ম্যাককেনা। ডেনমার্কের ক্লাব নর্ডসিল্যান্ড থেকে উইঙ্গার সিনদ্রে ওয়াল এগেলি, ওয়েস্ট ব্রমউইচ থেকে ডারনেল ফারলং এবং প্রতিপক্ষ নরউইচ থেকে মার্সেলিনো নুনিয়েজকে এনে দল সাজান তিনি। তবে নতুন রূপের এই দলটির শুরুটা ছিল হতাশাজনক। লিগে প্রথম জয়ের জন্য তাদের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। আগস্টে লিগ কাপ থেকেও বিদায় নিতে হয়েছিল তলানির দল ব্রমলির কাছে হেরে।
তবে অক্টোবর মাসের পর থেকেই বদলে যায় ইপসউইচের ভাগ্য। ২৫ অক্টোবর ওয়েস্ট ব্রমের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়টি ছিল মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। এরপর ১০ ম্যাচের মধ্যে তারা হার মাত্র একটিতে। বড়দিনের আগে তারা টেবিলের তৃতীয় স্থানে উঠে আসে। এরপর থেকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ঘরের মাঠ পোর্টম্যান রোডকে তারা কার্যত দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করে। পুরো মৌসুমে ঘরের মাঠে তারা হেরেছে মাত্র একটি ম্যাচ।
লিয়াম ড্যাপের অনুপস্থিতিতে গোল করার দায়িত্ব ভাগ করে নেন দলের বাকিরা। ১৬ গোল করে আসরের চতুর্থ সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন জ্যাক ক্লার্ক। অ্যাস্টন ভিলা থেকে আসা জ্যাডন ফিলোমিন উইংয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে করেন ১১ গোল। স্ট্রাইকার হিসেবে জর্জ হার্স্ট করেছেন ১০ গোল।
মৌসুমের শেষ ১৫ ম্যাচে ইপসউইচ ছিল অপ্রতিরোধ্য। এই সময়ে মাত্র একটি ম্যাচে হারের মুখ দেখেছে তারা। বিশেষ করে মার্চ ও এপ্রিলে সরাসরি পদোন্নতির প্রতিদ্বন্দ্বী মিলওয়াল ও মিডলসবরোর বিপক্ষে ড্র করে নিজেদের শীর্ষস্থান সুসংহত রাখে তারা।
শেষ দিনে কিউপিআরের বিপক্ষে ৩ মিনিটে হার্স্টের গোলটি ভক্তদের স্নায়ুচাপ কমিয়ে দেয়। এরপর ফিলোমিনের জোড়া গোল আর ম্যাচের অন্তিম লগ্নে ম্যাকাটিয়ারের গোল উৎসবে ভাসায় পুরো স্টেডিয়াম। চ্যাম্পিয়ন কভেন্ট্রি সিটির সঙ্গী হয়ে প্রিমিয়ার লিগে ফিরল ইপসউইচ। অন্যদিকে তৃতীয় দল হিসেবে প্রিমিয়ার লিগে ওঠার লড়াইয়ে প্লে-অফে মুখোমুখি হবে মিলওয়াল, সাউদাম্পটন, মিডলসবরো এবং হাল সিটি।
ইপসউইচ ভক্তদের জন্য এই জয় কেবল একটি ম্যাচ জয় নয়, বরং এক মৌসুমের কঠোর পরিশ্রম আর ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলে আবারও সেরাদের মঞ্চে ফেরার গল্প।
