শিরোনাম

ইউরোপে নতুন ‘আরব বসন্তের’ শঙ্কা? ফ্রান্স-ইতালিসহ ৯ দেশে আন্দোলনে বাড়ছে উদ্বেগ

 মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬

শিক্ষাসংকট, আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভে নেমেছেন তরুণেরা। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও আলবেনিয়াসহ অন্তত নয়টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবাদ। কোথাও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল ও ধর্মঘটের ঘটনা ঘটছে। এসব আন্দোলনের বিস্তার নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—ইউরোপ কি আরেকটি ‘আরব বসন্তের’ দিকে এগোচ্ছে?

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে ইউরোপেও বাড়ছে জনঅসন্তোষ। প্যারিস, মিলান, মাদ্রিদ ও তিরানার মতো শহরে সরকারের নীতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম। তবে সব দেশের আন্দোলনের কারণ এক নয়। কোথাও শিক্ষাব্যবস্থায় বিনিয়োগের ঘাটতি ও বাজেট কমানোর প্রতিবাদ, কোথাও আবাসনসংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবার কোথাও বেকারত্ব ও দুর্নীতির অভিযোগ আন্দোলনকে উসকে দিয়েছে।

ফ্রান্স, ইতালি, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়ায় বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসেও শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মীরা বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করছেন।

ইউরোপের অন্তত নয়টি দেশে বিক্ষোভের এই বিস্তার অনেককে মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০১০ সালের শেষ দিকে তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া ‘আরব বসন্তের’ কথা। সেই আন্দোলন মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা একাধিক শাসকের পতন ঘটে।

তবে ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি আরব বসন্তের সঙ্গে তুলনা করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দুই অঞ্চলের আন্দোলনের মধ্যে কিছু মিল থাকলেও লক্ষ্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় পার্থক্য রয়েছে। আরব বসন্তে বহু দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ছিল অন্যতম দাবি। বিপরীতে ইউরোপের বর্তমান বিক্ষোভের বড় অংশের লক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে ফেলা নয়; বরং সেই ব্যবস্থার মধ্যেই সংস্কার, জবাবদিহি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

ফ্রান্সকে ঘিরে প্রতিবাদের বিস্তার
ইউরোপের চলমান অস্থিরতার অন্যতম কেন্দ্র ফ্রান্স। গত ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবরের সপ্তাহান্তে দেশটির বিভিন্ন শহরে কয়েক লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। অনেক জায়গায় কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও প্যারিস, মার্সেই ও লিমোজসহ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের খবর পাওয়া যায়।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর দেশজুড়ে ১১০টি বিক্ষোভে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে আন্দোলনের আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল আট লাখ। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন প্রায় ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এই আন্দোলনের সূচনা আরও আগে। গত ২১ সেপ্টেম্বর ক্রেতেই শহরের লিসে সাঁ-একজুপেরি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ ভবন এবং অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপে শ্রেণিকক্ষে গাদাগাদি করে পাঠ নেওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেন। পরে তা অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হয় ট্রেড ইউনিয়ন এবং মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের অসন্তোষ।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে ঘটনাগুলোকে ‘বেপরোয়া’ বলে অভিহিত করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ফরাসিরা কীভাবে ফ্রান্সের সঙ্গে এমন করতে পারে?’

বিক্ষোভ ঘিরে দেশটিতে অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও জোরালো হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত করে মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, ‘এটি স্কুল নিয়ে নয়, বরং ইসলাম একটি একসময় মহান দেশকে দখল করতে চাইছে।’

ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থি নেত্রী মেরিন লে পেনও কয়েক দশকের অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনকে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন ও নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং প্যারিসের এইচইসি বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো আল জাজিরাকে বলেন, ‘ফ্রান্স এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। এখন এর প্রভাব ফ্রান্সের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।’

তবে তার মতে, বিভিন্ন দেশের বিক্ষোভকে একটিমাত্র আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ, দেশভেদে অসন্তোষের কারণ ও দাবিতে পার্থক্য রয়েছে। তারপরও শিক্ষায় অপর্যাপ্ত অর্থায়ন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলোতে আন্দোলনকারীদের মধ্যে মিল দেখা যায়।

ইতালি ও বেলজিয়ামে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
ফ্রান্সের পাশাপাশি ইতালিতেও গত ১৬ অক্টোবর শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে নামেন। শিক্ষা খাতে অর্থায়ন, সামরিক ব্যয় এবং সরকারের নীতির প্রতিবাদে তুরিন ও রোমে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল করেন তাঁরা। ফরাসি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কৌশল অনুসরণ করে ইতালির শিক্ষার্থীরাও বিদ্যালয় দখলের পথ বেছে নেন।

ইতালিতে ১৬ অক্টোবরের ‘নো মেলোনি ডে’ বা ‘মেলোনি নয় দিবস’-এর বিক্ষোভে বিদেশি শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ভর্তির ওপর প্রস্তাবিত সীমার বিরোধিতা করা হয়। বিক্ষোভকারীদের স্লোগান ছিল, ‘আ স্কুলা নেসুনো এ স্ত্রানিয়েরো’—অর্থাৎ, ‘স্কুলে কেউ বিদেশি নয়’। পাশাপাশি শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিও জানান তারা। ইতালির সংবাদ সংস্থা আনসা এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারের নতুন একটি জাতীয় ডিক্রিতে কিছু শ্রেণিকক্ষে অ-ইতালীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ শতাংশে সীমিত রাখার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া স্কুলে বোরকা ও নিকাব পরা নিষিদ্ধ করতে একটি ব্যবস্থা চালুর কথাও জানিয়েছেন মেলোনি।

গত ১৭ অক্টোবর মিলানে বিক্ষোভ চলাকালে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। মুখোশধারী কয়েকজন বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পাথর ও পাথরের চাঁই ছুড়ে মারেন। বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

বেলজিয়ামেও শিক্ষা খাতে ব্যয় সংকোচন, ফি বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। লিয়েজ শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্টিন কয়েকটি ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সেগুলোকে ‘নিছক সহিংসতা’ বলে অভিহিত করেন। ইউরোনিউজের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

আবাসনসংকট: তরুণদের নাগালের বাইরে নিজের ঘর
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আন্দোলনে আবাসনসংকট বড় একটি ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য সাশ্রয়ী বাসা খুঁজে পাওয়া কঠিন হচ্ছে। স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসে বাড়িভাড়া, বাসস্থানের অভাব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।

স্পেনে আবাসনসংকট গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ৮৭ বছর বয়সি মারিকারমেন আবাসকালকে তার বাসা থেকে উচ্ছেদের ঘটনার পর সেপ্টেম্বরে প্রতিবাদ জোরালো হয়। প্রকাশিত খবরে বলা হয়, তার বাড়িভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছিল। পরে তার মৃত্যুর ঘটনা উচ্ছেদ ও আবাসনসংকট নিয়ে মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।

মাদ্রিদে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা নিয়েও বিক্ষোভ করেন। একই সময়ে আবাসনের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্দোলনকারীরা আবাসিক সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ তহবিলগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানান।

প্রতিবেশী পর্তুগালের রাজধানী লিসবনেও গত ১৭ অক্টোবর বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়। সেখানে বাড়িভাড়া, মজুরি, পেনশন ও অবনতিশীল জনসেবার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিক্ষোভকারীরা।

এর আগে ১৫ অক্টোবর ভোরে পোর্তোতে আবাসনের দাবিতে গড়ে তোলা একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদী শিবির উচ্ছেদের সময় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের মারধর করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় প্রতিবন্ধী একজন ব্যক্তিসহ ৩৭ জন আহত হন। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি।

আবাসনসংকট তরুণদের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্যে। গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ—অর্থাৎ প্রতি চারজনের একজনের বেশি—অতিরিক্ত মানুষের সঙ্গে গাদাগাদি করে বসবাস করতেন।

এই পরিসংখ্যান আবাসনসংকটের পাশাপাশি তরুণদের স্বাবলম্বী হওয়ার প্রতিবন্ধকতাও তুলে ধরে। চাকরি পাওয়ার পরও বাড়িভাড়া, দৈনন্দিন খরচ ও অন্যান্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেকের পক্ষে স্বাধীনভাবে বসবাস করা সম্ভব হচ্ছে না।

আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি
ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় আলবেনিয়ায় বিক্ষোভকারীদের রাজনৈতিক দাবি আরও স্পষ্ট। দুর্নীতির অভিযোগ, বেকারত্ব এবং সরকারের প্রতি দীর্ঘদিনের অসন্তোষ সেখানে আন্দোলনের প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।

গত ১৭ অক্টোবর রাজধানী তিরানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে হাজারো তরুণ বিক্ষোভকারী জড়ো হন। প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিতে এটি ছিল টানা পঞ্চম দিনের ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা পুলিশের দিকে পাথর ছোড়েন। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, স্টান গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে।

কয়েক মাস ধরে জমে থাকা ক্ষোভও এই অস্থিরতার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ও বেকারত্বের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিতর্কিত উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে।

তবে পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এদি রামা। তার অভিযোগ, বিরোধীরা অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।

জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও গ্রিসেও প্রতিবাদ
ইউরোপে তরুণদের বিক্ষোভের বিস্তার কেবল সংঘর্ষের খবর পাওয়া দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও গ্রিসেও শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। তবে এসব দেশে আন্দোলনের মাত্রা ও তীব্রতা তুলনামূলকভাবে কম।

গত ১৬ অক্টোবর জার্মানির বার্লিনে আন্দ্রেয়াস-গিমনাজিয়ামের প্রবেশপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার প্রস্তুতি এবং শিক্ষা খাতে আরও বিনিয়োগের দাবিতে তারা এই কর্মসূচি পালন করেন। একই সঙ্গে ফ্রান্সের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতিও জানান তারা।

অস্ট্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট কমানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুরবস্থার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হচ্ছেন।

গ্রিসে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষের কেন্দ্রে রয়েছে আবাসন ব্যয়, বাসস্থানের সংকট, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনসংকট ও শিক্ষানীতি নিয়ে আন্দোলনের পাশাপাশি ক্লাস বর্জনের ডাকও দেওয়া হয়েছে।

অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো আল জাজিরাকে বলেন, গ্রিসে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জনের আহ্বান জানাচ্ছেন, জার্মানিতেও তারা সংগঠিত হচ্ছেন। অস্ট্রিয়ায়ও আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে এবং পরবর্তী সপ্তাহে আরও সংগঠিত কর্মসূচি হতে পারে।

আরব বসন্তের সঙ্গে কতটা মিল?
ইউরোপের বর্তমান অস্থিরতাকে আরব বসন্তের সঙ্গে তুলনা করার পেছনে রয়েছে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষের মতো কয়েকটি বিষয়।

কুয়েতি বংশোদ্ভূত মার্কিন সাংবাদিক আহমেদ এলদিন তার সাবস্ট্যাক প্রবন্ধ ‘ইউরোপস আরব স্প্রিং’-এ ইউরোপের বিক্ষোভের সঙ্গে ২০১১ সালের আরব বসন্তের তুলনা করেছেন। তার মতে, অর্থনৈতিক দুর্দশা, বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের প্রতি তরুণদের ক্ষোভ দুই আন্দোলনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য তৈরি করেছে।

তিনি সতর্ক করে লিখেছেন, ‘ইউরোপের সরকারগুলোর কাছে বিদ্রোহ দমন করার জন্য ট্যাংকের চেয়ে নীরব পদ্ধতি রয়েছে।’

আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী করার প্রসঙ্গে তিনি আরও লিখেছেন, ‘শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে পুলিশের চেয়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার কৌশল শিখেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি সময় ধরে টিকে থাকতে হলে তাদের আরও অনেক কিছু করতে হবে।’

মার্কিন বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তা হ্যারি হ্যালপিনও ইউরোপের পরিস্থিতিকে বিশ্বজুড়ে তরুণদের ক্ষোভের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, নেপাল থেকে ইউরোপ পর্যন্ত জেন-জির ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেওয়া দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাতদের বিরুদ্ধে একের পর এক বিক্ষোভ অনিবার্য।

ব্রিটিশ পডকাস্টার পিটার ম্যাককরম্যাকও মন্তব্য করেছেন, ‘ইউরোপ নিজেদের আরব বসন্তের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।’ তার মতে, কয়েক দশকের মূল্যস্ফীতি, সম্পদ কুক্ষিগত করা এবং আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়েছে।

তবে এসব বক্তব্য পর্যবেক্ষক ও ভাষ্যকারদের নিজস্ব মূল্যায়ন। এগুলো থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই যে ইউরোপের সব দেশের আন্দোলন একই লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তরুণ প্রজন্ম
বর্তমান আন্দোলনের পেছনে তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও বড় ভূমিকা রাখছে। শিক্ষা শেষ করে ভালো চাকরি পাওয়া, নিজের সামর্থ্যে বাসা ভাড়া করা কিংবা আগের প্রজন্মের তুলনায় উন্নত জীবন গড়ার প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন অনেকে।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক টিইউআই ফাউন্ডেশনের ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এক গবেষণায় ইউরোপের সাতটি দেশের ৮ হাজার ২৪ জন তরুণের মতামত নেওয়া হয়। এতে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৫২ শতাংশ আশঙ্কা করছেন, তাদের প্রজন্মের জীবনযাত্রার মান বাবা-মায়ের প্রজন্মের চেয়ে খারাপ হবে। বিপরীতে, মাত্র ২৫ শতাংশ মনে করেন, তারা বাবা-মায়ের চেয়ে ভালো জীবন পাবেন।

এই ফলাফল তরুণদের মধ্যে জমে থাকা হতাশার একটি চিত্র তুলে ধরে। তাদের অনেকের কাছে ভবিষ্যৎ আর নিশ্চিত উন্নতির প্রতিশ্রুতি নয়; বরং ব্যয়বহুল জীবন, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান ও সীমিত সুযোগের বাস্তবতা।

এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষা ও আবাসনের মতো মৌলিক বিষয়ে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে। তরুণদের একটি অংশের ধারণা, প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারছে না।

আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তি, নাকি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি?
ইউরোপের বর্তমান বিক্ষোভের সঙ্গে আরব বসন্তের কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। তরুণদের ক্ষোভ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা—দুই ক্ষেত্রেই এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত সংগঠিত হওয়া এবং এক দেশের আন্দোলন থেকে অন্য দেশের তরুণদের অনুপ্রাণিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে পার্থক্যও কম নয়। ২০১১ সালের আরব বসন্তে তিউনিসিয়া, মিসরসহ বিভিন্ন দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। কয়েকটি দেশে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শাসকদের পতন ঘটে। অন্যদিকে ইউরোপের অধিকাংশ দেশে নির্বাচনী রাজনীতি, বিরোধী দল, আদালত ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে।

এ কারণে ইউরোপের বিক্ষোভকারীদের বড় অংশের দাবি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা নয়; বরং সরকারি নীতির পরিবর্তন, দুর্নীতির জবাবদিহি, শিক্ষা ও আবাসনে বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান থাকলেই মানুষের অসন্তোষ দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তরুণেরা যদি দেখেন জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, কর্মসংস্থান অনিশ্চিত থাকছে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না, তাহলে ক্ষোভ আরও তীব্র হতে পারে।

এ অবস্থায় ইউরোপের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে আন্দোলনের পেছনে থাকা বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান করা। এসব সংকট মোকাবিলায় সরকারগুলো কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে বর্তমান বিক্ষোভের ভবিষ্যৎ গতিপথ।

Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *